পাহাড় চূড়ায়
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
অনেকদিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ ।
কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না ।
যদি তার দেখা পেতাম,
দামের জন্য আটকাতো না ।
আমার নিজস্ব একটা নদী আছে,
সেটা দিয়ে দিতাম পাহাড়টার বদলে ।
কে না জানে, পাহাড়ের চেয়ে নদীর দামই বেশী ।
পাহাড় স্থানু, নদী বহমান ।
তবু আমি নদীর বদলে পাহাড়টাই
কিনতাম ।
কারণ, আমি ঠকতে চাই ।
নদীটাও অবশ্য কিনেছিলামি একটা দ্বীপের বদলে ।
ছেলেবেলায় আমার বেশ ছোট্টোখাট্টো,
ছিমছাম একটা দ্বীপ ছিল ।
সেখানে অসংখ্য প্রজাপতি ।
শৈশবে দ্বীপটি ছিল আমার বড় প্রিয় ।
আমার যৌবনে দ্বীপটি আমার
কাছে মাপে ছোট লাগলো। প্রবহমান ছিপছিপে তন্বী নদীটি বেশ পছন্দ হল আমার ।
বন্ধুরা বললো, ঐটুকু
একটা দ্বীপের বিনিময়ে এতবড়
একটা নদী পেয়েছিস ?
খুব জিতেছিস তো মাইরি !
তখন জয়ের আনন্দে আমি বিহ্বল হতাম ।
তখন সত্যিই আমি ভালবাসতাম নদীটিকে ।
নদী আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিত ।
যেমন, বলো তো, আজ
সন্ধেবেলা বৃষ্টি হবে কিনা ?
সে বলতো, আজ এখানে দক্ষিণ গরম হাওয়া ।
শুধু একটি ছোট্ট দ্বীপে বৃষ্টি,
সে কী প্রবল বৃষ্টি, যেন একটা উৎসব !
আমি সেই দ্বীপে আর যেতে পারি না,
সে জানতো! সবাই জানে ।
শৈশবে আর ফেরা যায় না ।
এখন আমি একটা পাহাড় কিনতে চাই ।
সেই পাহাড়ের পায়ের
কাছে থাকবে গহন অরণ্য, আমি সেই অরণ্য পার হয়ে যাব, তারপর শুধু রুক্ষ
কঠিন পাহাড় ।
একেবারে চূড়ায়, মাথার
খুব কাছে আকাশ, নিচে বিপুলা পৃথিবী,
চরাচরে তীব্র নির্জনতা ।
আমার কষ্ঠস্বর সেখানে কেউ শুনতে পাবে না ।
আমি ঈশ্বর মানি না, তিনি আমার মাথার কাছে ঝুঁকে দাঁড়াবেন না ।
আমি শুধু দশ দিককে উদ্দেশ্য করে বলবো,
প্রত্যেক মানুষই অহঙ্কারী, এখানে আমি একা-
এখানে আমার কোন অহঙ্কার নেই ।
এখানে জয়ী হবার বদলে ক্ষমা চাইতে ভালো লাগে ।
হে দশ দিক, আমি কোন দোষ করিনি ।
আমাকে ক্ষমা করো ।
0 Comments